Nur Amin Lebu

Nur Amin Lebu

Web Designer & Developer, Blogger & Online Activists

জিবন নদী পারাপার -১

১.

নদের নাম দুধকমর। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত রায়ডাক নদী বা সঙ্কোশ নদী ভূরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরীর কাছে দুধকুমর নাম ধারণ করেছে। এ নদীতে প্রচুর পরিমানে মাছ পাওয়া যায়। অনেক জেলে নদী থেকে মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে । বর্ষাকালে এখানে নৌকাবাইচ খেলা হয়।

উপ্ত হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে বসে আছে জিবন ও নদী। একদিকে ভারত থেকে বয়ে চলা দুধকমর নদী, অন্যদিকে জিবনের নদী। নদীরে পাড়ে বসে গল্প করছে দুজন। জিবন মাধ্যমিক পড়ুয়া ছেলে। সবে মাত্র কলেজে উঠেছে। নদী পড়ে নবম শ্রেণিতে। ভালবাসা-প্রেম বুজতে শিখেছে। জিবন – নদী গল্পের আড়ালে স্বাধীন তাদের পাহাড়া দিচ্ছে। তারা শহর থেকে দক্ষিন দিকের দুধকমর নদীতে বেড়াতে এসেছে। জিবনের হাত ধরে নদী প্রকৃতিকে দুচোখ ভরে দেখছে। ভাবছে, এই নদী শুধুই জিবনের। জিবন যতদিন বেঁচে থাকবে, নদী তারই থাকবে। পড়ন্ত বিকেলে উড়ন্ত মনে উড়ে চলেছে দুজনই।

৪০ মিনিট পর, আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। কালো মেঘে আকাশ অন্ধকারে ছেয়েছে। তড়িঘড়ি করে জিবন-নদী আর স্বাধীন দ্রুতই দুধকমর নদী ত্যাগ করে শহরের দিকে রওয়ানা দিল। গ্রামের রাস্তায় রিস্কা পাওয়া যায় না৷ হেঁটেই যেতে হবে। দ্রুত তারা হাটতে শুরু করল। প্রায়, ৩০ মিনিট পথ পারি দিয়ে অবশেষে শহুরে রাস্তার দেখা মিলল। তিনজনের বাড়ি কাছাকাছি। মাত্র, আধা কিলো দুরত্ব। শহুরে রাস্তায় এসে জিবন নদীকে রিস্কায় তুলে দিয়ে বলল, ‘বাড়িতে পৌঁছে একটি কল দিও’। নদী, মাথা নেড়ে ‘ঠিক আছে’ বলে বিদায় নিল।

২.

জিবনের পরিবার নিম্ন মধ্যবিক্ত। বাবা ব্যবসায়ী, মা বাড়িতেই ঘরের কাজ করে। সে রাত ১২ টায় দোকান থেকে বাড়িতে এসেছে। বাজারে জিবনের বাবার একটি মুদি দোকান আছে। সারাদিন সে দোকানেই সময় দেয়। বাবা বলেছে, ব্যবসা নিজের করে নিতে।

ঘরে এসে জিবন হাত ধুয়ে ভাত খেতে বসেছে। দু মুঠো ভাত মুখে গুঁজে দিতেই ফোন কেঁপে উঠল। নদী, কল দিয়েছে। ‘এখুনি আসলাম, ভাত খেয়ে কল ব্যাক করছি’ মেসেজ পাঠিয়ে দেয়, নদীর ফোনে। ফিরতি মেসেজে ‘খেয়ে কল দিও ‘ বার্তাটি জিবনের ফোন স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। পাঁচ মিনিটে খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে চলে গেল জিবন। শুয়েই নদীকে কল দিল।

-খেলাম, কি করছ তুমি?
-তোমার কলের অপেক্ষায় বসে আছি
-আমি মাত্র দোকান থেকে আসছি। আজ শরীরটা ক্লান্ত।
-কেনো কি হয়েছে?
-মাথা ব্যাথা করছে
-ঔষধ খেয়ে নাও
-খাবো না, তোমার সাথে কথা বললেই ঠিক হয়ে যাবে
-পাগলামি কর না, খেয়ে নাও
-লাগবে না, তোমার শরীর এখন কেমন?
-সুস্থ আছি। জ্বর কমেছে

ঘরের লাইট বন্ধ করে কথা বলছে জিবন। রাত দেড়টা বেজে গেছে। দুজনের কথোপকথন বিন্দুমাত্র থেমে নেই। চারিদিকে ঝি ঝি পোঁকার শব্দধ্বনি। রাত গভীর হতেই ভালবাসীয় আবেগ বেড়ে চলেছে। চুপি চুপি কথাতেও মনে প্রশান্তি বহে। ভালবাসার মানুষের সাথে সারারাত কথা বললেও ক্লান্তি আসে না।

৩.

ঘড়ির কাঁটায় ১২ টা বেজে গেছে। নদী ঘুমাচ্ছে। ছুটিতে স্কুল বন্ধ দিয়েছে। তাই, নদীর মা ঘুম থেকে ডাকেনি। রাত ৪ টা পর্যন্ত সে জিবনের সাথে কথা বলেছে। হঠাৎ, নদীর ফোনে হিন্দি গানের রিংটোনে কেঁপে উঠল। নদী কল ধরতেই, জিবনের কন্ঠ শুনতে পেল। এখনও ঘুমাচ্ছ? উঠো। দুপুর ১২ টা বেঁজে চলল। দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নদী বুঝতে পারে দুপুর হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা, উঠতেছি। ফ্রেস হয়ে কল দিব বলেই কল কেটে দিল সে৷

প্রায় রাতই জেগে নদীর রাতজাগা অভ্যাস হয়ে গেছে। মুখ ধুয়ে না খেয়েই নিজ ঘরে চলে যায়। নদীর বাবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে। মা গৃহিণী। বড় ভাইয়ের নাম অন্তর। নদী ও অন্তর দু ভাই-বোন। পরিবারের ছোট ও একমাত্র মেয়ে হওয়ায় ভালবাসার কমতি নেই। বাবা-মায়ের আদরের টুকরো। মেয়ে কাউকে ভালবাসে মা আন্দজ করতে পেরেছে। এই বয়সে মেয়ের চলাফেরা দেখে মা আঁচ করতে পেরেছে।

-কোথায় তুমি?
-দোকানে আসলাম
-খেয়েছ?
-হ্যা, তুমি?
-খাইনি, পরে খাব
-খেয়ে নিও, আমি ফ্রী হয়ে কল দিব
-আচ্ছা, ঠিক আছে

কথা শেষ করে নদী খেতে চলে যায়। পাশের ঘর থেকে তার মা রোকেয়া বেগম সব শুনতে পেল। মেয়ে বড় হয়েছে। এই বয়সে প্রেম-ভালবাসা হয়েই থাকে। ভাবতে ভাবতে রোকেয়া বেগম ঘরের কাজে মনোযোগ দেয়।

৪.

ক’দিন থেকে জিবনের শরীর ভাল না। নদীকে সে বুঝতেও দেয় না। দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে। বাহিরের প্রকৃতিতে নিজেকে বিলীন করে দিতে চায়। নদীকে তার পরিকল্পনার কথা জানাতেই সে রাজী হয়ে যায়। সামনের শুক্রবার দিন ঠিক করা হয়। জিবন স্বাধীন কে, নদী তার বান্ধবী মিমকে সঙ্গে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একা একা গেলে একঘেয়েমি মনে হতে পারে। তাই, দুজন দুজনের বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।

বিশাল নদী। সূর্যরশ্মির নিবিড় সখ্যতায় ঝলমল করে স্রোত। কখনও জোয়ার, কখনও ভাটা। নদীর পারে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। বাঁধের ওপরদিকে বিশাল সবুজ মাঠ। পড়ন্ত বিকালে পাড়ার ছেলেরা ফুটবল ও ক্রিকেট খেলে। মাঠের চতুর্দিকে বাঁধের উপরে গাছ লাগিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য লোকজন প্রতিদিনই উপস্থিত হয়। স্বামী-স্ত্রী, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিক যুগল সবারই প্রিয় স্থান। শেষ বিকেলে মায়া জড়ানো অপূর্ব মুহূর্ত উপভোগে ছুটে আসে দূর-দূরান্ত থেকে।

নয়নজুড়ানো অপরূপ সৌন্দর্য খুঁজতে নদীর কাছে যাওয়া সত্যি উপভোগের। পড়ন্ত গোধূলি বেলায় লাল সূর্যকে হাতের মুঠোয় বন্দী করার ভঙ্গি ধরছে জিবন। দুশো হাত দূরে বাদামওলায়া বাদাম বিক্রি করছে। দূর নদীতে একটি ডিঙ্গি নৌকা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
জিবন নদী হাতে হাত রেখে হেঁটে চলেছে। পিছনে স্বাধীন ও মিম তাদের অনুসরণ করছে। নদীর পাড়ে গোধূলিলগ্ন উপভোগে জিবনের মনের ক্লান্তিগুলো দূর হয়ে যাচ্ছে।

-আজকের আকাশটা নীলে সেজেছে, দেখতে পারছ? ‘নীল আকাশের মেঘবালিকা, আকাশের নীলে উড়ে এসে জিবনের সাথে মিশে গেছে’ জিবনের প্রতুত্তরে নদী শক্ত করে হাতটি ধরে নিল। মিমের ডাকে পিছনে ঘুরে দাড়ায় দুজন। মিম বাদাম নিয়ে এসেছে। এক পোটলা জিবনের হাতে দিয়ে পাশে চলে যায়। প্রেমের সাথে বাদামের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। প্রেম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পার্কেই করে থাকে কপোত কপোতিরা। সেখানে বাদাম খুব সহজলভ্য এবং সময় কাটানোর অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে।

(চলবে..)

DROP A COMMENT

Your email address will not be published.

Email
Phone
WhatsApp
Messenger
Messenger
WhatsApp
Phone
Email